পলিথিনের পুনরুত্থান ও আমাদের পরিবেশ
বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে আমাদের জীবনে নতুন গতির সঞ্চার করেছে। প্রতিনিয়ত বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার আমাদেরকে মুগ্ধ করছে। ইন্টারনেট ব্যবহার করে খুব অল্প সময়েই বৈচিত্র্যময় এ বিশ্ব দেখতে আমরা সমর্থ হচ্ছি। বিজ্ঞান আমাদের নানাভাবে উপকৃত করছে এটা সত্যি, কিন্তু অন্যদিকে বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগ ও অনিয়মতান্ত্রিক ব্যবহার ভয়াবহ নানা বিপর্যয়ের সৃষ্টি করছে। তেমনি পলিথিন ও প্লাস্টিক দ্রব্যের নানামুখি ব্যবহার আজ আমাদের পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০২ সালের ৮ এপ্রিল সরকারি সিদ্ধান্তে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, ব্যবহার ও বহন নিষিদ্ধ ঘোষণা করার প্রজ্ঞাপন জারির পর আজ ৭ বছর অতিবাহিত হলেও, আইন বাস্তবায়নের কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ আমরা লক্ষ্য করছি না। এদিকে উপযুক্ত তদারকি ও বিকল্প পরিবেশসম্মত ব্যাগের অভাবের কারণে নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন ব্যাপকভাবে আবার ফিরে এসেছে। চারপাশে নানা রঙে, নানা চেহারার পলিথিন। মিনারেল ওয়াটার ও কোমল পানীয় বোতলসহ হোটেল-রেস্টুরেন্টে একবার ব্যবহার্য থালা, বাটি, কাপ, গ্লাস ইত্যাদি একেবারে নির্বিঘ্নে বিক্রি ও ব্যবহৃত হচ্ছে। সেইসাথে শহরের ডাস্টবিনগুলোর দিকে তাকালে ডাস্টবিন উপচে পলিথিন ব্যাগ ড্রেনে, ড্রেন বেয়ে পার্শ্ববর্তী নদী ও খালে যাচ্ছে – এ দৃশ্য আমাদের খুবই চেনা। সারা দেশজুড়েই আবারো প্রসার ঘটেছে এ সকল প্যাকেজিং ও বোতলজাত পণ্যের। তাই এটা বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না যে, বর্তমান সময়ে এসে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন নিশ্চয়ই আমরা দেখতে শুরু করেছি, কিন্তু আসলে আমরা যেন এক ‘প্লাস্টিক যুগে’ই বসবাস করছি। এ কথা অনেকেরই হয়তো জানা আছে যে, ১৯৮২ সালে বাণিজ্যিকভাবে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার শুরু হয় বাংলাদেশে। দামে কম, ব্যবহারে সুবিধা এবং মূলত এর সহজলভ্যতাই পলিথিন ব্যবহারে মানুষকে ক্রমেই অভ্যস্ত করে তোলে এবং খুব অল্প সময়েই সারা দেশে ব্যাপকভাবে এর বিস্তার ঘটে। আমরা আমাদের পূর্বের ‘ভালো’ অভ্যাসগুলোকে বর্জন করে আধুনিকতা ও উন্নয়নের নামে প্রতিনিয়তই পরিবেশের ক্ষতি সাধন করতে থাকি। আমরা পণ্যের চাকচিক্য বৃদ্ধিতে এবং সহজে বহনযোগ্য বা সামান্য আরাম-আয়েসের জন্য অতিমাত্রায় প্যাকেটজাত, বোতলজাত পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকি। অবশেষে, পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠনের পলিথিনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মুখে সরকার ২০০২ সালের ৮ এপ্রিল সমগ্র দেশে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধকরণের একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়: “পলিথিন শপিং ব্যাগের নির্বিচার ব্যবহার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর রূপ ধারণ করিয়াছে। এমতাবস্থায়, পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিবেশগত মান উন্নয়ন ও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রশমনকল্পে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (১৯৯৫ সালের ১ নং আইন)-এর ৬ক (সংশোধিত ২০০২) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সকল বা যে কোন প্রকার পলিথিন শপিং ব্যাগ অর্থাৎ পলিইথাইলিন, পলিপ্রপাইলিন বা উহার কোন যৌগ বা মিশ্রণ-এর তৈরী কোন ব্যাগ, ঠোংগা বা অন্য কোন ধারক যাহা কোন সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় বা কোন কিছু রাখার কাজে বা বহনের কাজে ব্যবহার করা যায় উহাদের উৎপাদন, আমদানী, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের তারিখ হইতে সমগ্র দেশে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হইল।” এখানে উল্লেখ্য যে, উপরিউক্ত প্রজ্ঞাপনটি বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় ১১-৪-২০০২ ইং তারিখে প্রকাশিত হয়। সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা জারির পর এর ব্যবহার অনেকাংশে কমে গিয়েছিল। জনজীবন ও পরিবেশের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করলেও অত্যন্ত দুঃখজনক সত্য যে, খুব বেশিদিন এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে পলিথিন ব্যাগ আবার বিভিন্ন চেহারায় বাজারে ফিরে আসছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার দিন দিন আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব জিনিস বাজারজাত করার জন্য প্লাস্টিকের মোড়কে আবদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তারপরও বাজারে গেলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে: চাল, ডাল, আলু, পিঁয়াজ, রসুন, মসলা, চা, বিস্কুট থেকে শুরু করে কাঁচা তরি-তরকারি পর্যন্ত সকল দ্রব্য প্লাস্টিকের প্যাকেটে বাজারজাত করা হচ্ছে। এছাড়া দোকানে দোকানে অজস্র পলিথিন ব্যাগের চাতুরিপূর্ণ ব্যবহার আজ বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। প্লাস্টিক বোতলসহ পণ্য মোড়কীকরণে ব্যবহৃত প্লস্টিকের বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে দেওয়ায় ড্রেন, নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট হয়ে যাচ্ছে, জমিতে পড়ে জমি চাষের উর্বরতা হারাচ্ছে এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতি ইত্তেফাকে (১২ এপ্রিল, ২০০৯) প্রকাশিত এক তথ্য থেকে জানা যায়, রাজধানীর সাত’শ কারখানায় নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরি হচ্ছে। এছাড়া লবণ ও চিনিসহ ২৩ প্রকার প্যাকেজিং পলিথিন উৎপাদনের অনুমোদন নিয়ে চালু রাখা দেড় শতাধিক কারখানার মধ্যে অর্ধ-শতাধিক কারখানাই বর্তমানে অবৈধ পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন করে থাকে। উৎপাদিত পলিথিন বাজারজাতও হচ্ছে বিনা-দ্বিধায়। পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ আইন থাকা সত্ত্বেও পলিথিন ব্যাগ বন্ধের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর নিস্ক্রিয়তা সত্যিসত্যিই বিস্ময়ের বিষয়! পলিথিন ব্যাগ এবং প্লাস্টিক দ্রব্য পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত ও সর্বজনস্বীকৃত। তাই দেশের জনগণ চায় পরিবেশ উন্নয়নের স্বার্থে পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করার পাশাপাশি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী এবং প্যাকেজিং এর উপর একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক। এছাড়া পলিথিন কারখানাসমূহ বন্ধ করাসহ উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জরুরি। পলিথিন ব্যাগের কুফল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে এবং পলিথিনের বিকল্প ব্যাগ সাধারণ জনগণের হাতের নাগালে পাওয়া ও কমমূল্যে যাতে সাধারণ জনগণ পেতে পারে তার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে পাটশিল্পকে চাঙ্গা করার দাবিও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অনেকবার উঠেছে। কিন্তু সুলভমূল্যে পাটের ব্যাগ বাজারজাত করার জন্য সরকার আজ পর্যন্ত কি কি উদ্যেগ গ্রহণ করেছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ একটি বিষয়। অনেকটা এ কারণে দেশের অধিকাংশ মানুষ বাধ্য হয়েই এখনো নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবহার করে চলেছে। আমরা মনে করি, পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ ঘোষণা করার ফলে পরিবেশ আন্দোলনে একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এটি ধরে রাখা প্রয়োজন। এজন্য সরকারকেই আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। পলিথিনের বিরুদ্ধে প্রণীত আইন বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের একটি মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। একইসাথে প্রণীত আইনটির ব্যাপক প্রচার এবং জনসচেতনতা তৈরির ব্যাপারেও সরকারকে গুরুত্ব সহকারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ সকল কাজে সরকারের পাশাপাশি প্রচার মাধ্যমকেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি সবচেয়ে বড় যা প্রয়োজন তা হলো একজন নাগরিকের অবস্থান থেকে প্রত্যেকে সচেতন হয়ে ওঠা এবং পলিথিনকে ‘না’ বলা, একইসাথে অন্যকে সচেতন করে তুলতে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করা। তবেই পলিথিনের পুনরুত্থান রোধ করা সম্ভব হবে, সম্ভব হবে পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করা ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করা।
৪ জুন, ২০০৯ ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ প্রকাশিত
Tags: Written by Bidhan Chandra Pal
You can comment below, or link to this permanent URL from your own site.