তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান
নিঃসন্দেহে এটি আশার কথা যে, অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রামের ফসলে পুষ্ট হয়ে বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও এটি বাস্তবায়নের একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। আইনের মাধ্যমে বিড়ি-সিগারেটসহ সকল প্রকার তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা হয়, বাস-ট্রেন-হাসপাতাল-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ পাবলিক প্লেসে ধুমপান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নানা ঘোষণায় এবং গুরুত্বপূর্ণ দলিলে এ সংক্রান্ত সুস্পষ্ট অঙ্গীকার প্রদান করে। এর ফলশ্রুতিতে ধুমপান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবার সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাবলিক পরিবহন ও কর্মস্থলসহ ধুমপানমুক্ত পরিবেশ ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকে, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় সচেতনতা। কিন্তু এত কিছুর পরও তামাক চাষ ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার কাঙ্খিত মাত্রায় কমে নি- ফলে এর বিরূপ প্রভাবে ভুক্তভোগী হতে হচ্ছে আমাদের সকলকেই। তাই এ বিষয়টি নিয়ে আবারো আলোচনা করা ও কার কী করণীয় তা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বর্তমান বাস্তবতায় প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজেদের উন্নয়ন নিজেদেরকেই করতে হবে। এর জন্য কৌশল নির্ধারণসহ প্রয়োজনীয় সকল ভাবনাও ভাবতে হবে আমাদেরকেই। বাংলাদেশের অন্যতম সম্পদ জনশক্তির যথাযথভাবে কাজে লাগাবার পূর্বশর্ত হচ্ছে সুস্থ-সবল মানুষ। তাই দেশের প্রয়োজনে ও আত্মনির্ভরশীল দেশ বিনির্মাণে ধুমপান ও তামাকমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আর তাই ধুমপান ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার প্রতিরোধ, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন ও আইন উন্নয়নে জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রাধিকার প্রদান ও এজন্য সকলকেই সোচ্চারভাবে এগিয়ে আসা আজ একান্ত জরুরি। বর্তমানে দেশের একটি বড় অংশের জনগোষ্ঠী ধুমপান ও তামাকজাত সামগ্রী গ্রহণের ফলে অনেকক্ষেত্রেই প্রাণঘাতি রোগের শিকার। প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব ও স্বাস্থ্যগত দিক ক্ষতিগ্রস্থ হবার ফলে ধুমপায়ীর জন্যই শুধু নয়, অধুমপায়ীর বিশেষত শিশু ও নারীদের জন্য এক ভয়াবহ সংকটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। যা আমাদের সকলের কাঙ্খিত সুন্দর ভবিষ্যতকে ও দেশের অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকির মাঝে ফেলে দিতে পারে। আমি এ বিষয়ে কোনো বিশেষজ্ঞ নই, তবে একজন সাধারণ সচেতন নাগরিকের অবস্থান থেকে এর ভয়াবহতা কতটুকু তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি বলেই এই লেখা এবং বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে নিজেকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রাখার তাগাদা লাভ করেছি। পৃথিবীতে প্রতিদিন ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ কিশোর/তরুণ তামাক সেবন শুরু করছে। বাংলাদেশেও প্রতিদিনই অনেক নতুন নতুন মুখ ধুমছে ধুমপান শুরু করছে। কিন্তু এর ব্যবহার যে নানা দিক থেকেই আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে প্রতিনিয়ত তার পরিসংখ্যান বোধ হয় আমরা সবাই জানি না। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যান অনুসারে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতি বছর তামাকের কারণে ১ কোটি লোক মারা যাবে। আর এর ৭০ লক্ষই হবে আমাদের মতো দরিদ্র দেশগুলোতে। বাংলাদেশেও ধূমপানের কারণে প্রতিবছর ৫৭,০০০ মানুষ মারা যায় এবং ৩,৮২,০০০ মানুষ তামাকজনিত কারণে পঙ্গুত্ববরণ করছে। তামাকের কারণে প্রতিবছর দেশে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২,৬০০ কোটি টাকা। দুর্বল অবকাঠামো, অর্থনৈতিক মন্দা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, ব্যাপক দারিদ্রতার ফলে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে তাই সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চয়ই আমরা অনুভব ও অনুধাবন করতে পারি। অনেকেই এজন্য আশঙ্কা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, এ সমস্যা আসলেই একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা – ধীরে ধীরে যা আমাদের মারাত্মক সংকটের দিকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একটি উদাহরণ দিলে তা আরো পরিষ্কার হবে সেটি হলো, পরিবেশগত বিষয়। যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের দেশসহ সারা বিশ্ব এখন সচেতন ও সোচ্চার হয়ে করণীয় নির্ধারণ করছে আর ঠিক সে সময়ই তামাকের কারণে প্রতি বছর পৃথিবীতে ২ লক্ষ হেক্টর বন উজাড় হচ্ছে। আমার মনে হয়, এর মূল কারণই হলো ধুমপান তথা তামাকের ব্যবহার যত পুরাতন তার প্রতিরোধের প্রচেষ্টা ততটা পুরানো নয়। আর দিনে দিনে এই প্রচেষ্টা যতটা প্রসার ও প্রচার লাভ করার কথা ততটা হয়ে ওঠে নি। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, তামাকজাত পণ্যসামগ্রী গ্রহণ থেকে মানুষকে বিরত করাটা অনেকেই মনে করেন যে এটি একটি দুরূহ কাজ, কারণ মানুষের অভ্যাসের সাথে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আধুনিক ফ্যাশন হিসেবে মানুষের জীবনের সাথে আজ এটি অতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হওয়া এই অভ্যাস মানুষকে বছরের পর বছর ধরে তিলে তিলে ধ্বংসের পথেই নিয়ে যায়। কয়েকটি তথ্য থেকে এ বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হবে: সিগারেটের ধোঁয়ায় প্রায় ৪০০০ ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য রয়েছে, যার মধ্যে ৪৩টি ক্যান্সার সৃষ্টির সাথে জড়িত। সিগারেটের ধোঁয়া অধূমপায়ীরও হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তামাক ব্যবহার ৯৫ ভাগ ফুসফুস ক্যান্সারের জন্য দায়ী। এছাড়া তামাক সেবনে প্রতিদিন অকালে প্রাণ হারাচ্ছে অনেকেই। তাই নিঃসন্দেহে জাতির জন্য এ এক গভীর সংকট। যা দারিদ্র্যতা টিকেয়ে রাখতে এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনে আমাদেরকে পিছিয়ে রাখতে সহায়তা করছে। তাই আজকের এই সঙ্কটে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা কীভাবে একত্রিত হতে পারি তা দ্রুত ভাবা প্রয়োজন। কেউ বুঝে আবার কেউ বা না বুঝে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এ সংক্রান্ত ক্ষতির মুখোমুখি, অনেকেই এ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে প্রাণান্ত প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন। এ প্রচেষ্টায় তাদের পাশে দাঁড়াতে আগ্রহী ব্যক্তি-গোষ্ঠী-সংস্থাসমূহের সংগঠিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ এর দ্বারা আমরা সকলেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি, তাই এ দীর্ঘস্থায়ী সংকট মোকাবেলায় প্রতিটি ব্যক্তি মানুষেরই কিছু করণীয় রয়েছে। তাই জরুরি কাজগুলো চিহিৃত করে প্রত্যেককেই সম্পৃক্ত হতে হবে সুনির্দিষ্ট দায়িত্বের সাথে। তামাক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সকল পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে – জনগণের প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ। আক্রান্ত জনগোষ্ঠী নানাদিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্থ, তাই ভাই-বোন-বন্ধু হয়ে তাদের বোঝাতে হবে, পাশে দাঁড়াতে হবে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় – “…আমাদের দেশে আসলে …আশার অভাব, ভরসার অভাব।” তামাক সেবনের প্রতি প্রবল অকাক্সক্ষার মাঝে আমরা কাছের মানুষ হয়ে তাদের পাশে দাঁড়ালে এ থেকে বিরত থাকা একটি অঙ্গীকারে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে। যারা বন্ধুর মতো তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চান, তাদের মূল কাজ – তাদের সৃজনশীলতাকে জীবন্ত রাখা এবং সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে এগুলো বিকাশের পথ উন্মোচন করা। আর এর মাধ্যমেই পরিবার-সমাজ ও পুরো দেশ উপকৃত হতে পারে। এছাড়া দারিদ্র্য নির্মুলে দেশের মানুষকে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সচেতন করে তোলাও অতীব জরুরি। ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট পরিচালিত ‘হাংরি ফর টোব্যাকো’ এক গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক ব্যবহারকারীরা তাদের মাসিক গৃহস্থালী খরচের ৪.৫% তামাকের পেছনে ব্যয় করেন। তাই তামাকজাত পণ্যসামগ্রী সেবনের ফলে সৃষ্ট অপব্যয় থেকে বিরত রাখা আরো জরুরি। এজন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হলো প্রয়োজনীয় তথ্যের যোগান দেয়া। রেডিও, টেলিভিশন, খবরের কাগজ, বেসরকারি সংস্থার কর্মীসহ সকলের এখন দায়িত্ব হলো তামাকজাত দ্রব্য সেবন কেন ক্ষতিকর, কার ক্ষতি (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি, আসলে তা নিজের এবং নিজের দেশেরই ক্ষতি), কেন তামাকজাত পণ্য নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে কী আছে, কেন তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের উন্নয়ন প্রয়োজন ইত্যাদি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত জরুরি তথ্যসমূহ গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করা। মানুষ যদি যথাযথ তথ্য পায়, তাহলে তারা নিজেরাই নিজেদের করণীয় অনেকাংশে সম্পাদন করতে পারবে। আমি পূর্বেই বলেছি যে, ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ ও নানা সংগঠন আন্তরিকতার সাথে তামাক নিয়ন্ত্রণ ও আইন বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করেছে। কিন্তু প্রয়োজন আরো অনেক বেশি। সারা দেশের সকল স্থানে প্রতিটি ইউনিয়নে আজ তাই উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। ধুমপানজনিত সকল রোগ থেকে তাদের রক্ষা করা জরুরি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তথা সরকারের একার পক্ষে এ সকল জরুরি কাজ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের পুরো মাত্রায় এ কাজে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। এছাড়া আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি সরকারিভাবে গৃহীত নীতিমালারও সঠিক ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সকল এনজিও এবং স্বেচ্ছাব্রতী কর্মীদেরকে এলাকাভিত্তিতে সংগঠিত হয়ে, পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ ও পরিচালনা করা প্রয়োজন। যারা এর ছোঁবলে আক্রান্ত হয় নি তাদেরকেও এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। প্রদর্শন করতে হবে মানুষ হিসেবে নিজেদের দায়িত্ববোধ। তামাকজাত দ্রব্য সেবন থেকে বিরত হওয়ার পর অনেকের চিকিৎসা গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে, এজন্যও প্রযোজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্বেচ্ছাসেবকরা চাইলে তাদের সুবিধাজনক স্থানে এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তামাক নিয়ন্ত্রণে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ও প্রয়োজনে নিজ এলাকায় ‘তথ্যকেন্দ্র’ স্থাপনসহ নানা ধরনের সচেতনামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। যে সকল এলাকায় তামাক চাষ হয়ে থাকে ও যে সকল ব্যবসায়ীরা তামাকজাত পণ্য সামগ্রী বিক্রয় করে থাকে তাদেরকেও ধীরে ধীরে বিকল্প চাষে উৎসাহিত করে তোলা ও এ সংক্রান্ত ক্ষতির দিক অবগত করানোর লক্ষ্যে পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। আজ তাই সচেতন নাগরিক সমাজের কাছে আহ্বান – আসুন, আমরা সবাই মিলে সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করি, অধুমপায়ীর অধিকার সংরক্ষণ করি এবং তামাকের বিষাক্ত ছোবল থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করি। তামাক বিরোধী প্রচেষ্টা আরো জোরদার হোক, দেশের জনগণ তামাক ও ধুমাপানের ক্ষতিকর বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠুক – আজকের দিনে এটিই আমাদের আন্তরিক প্রত্যাশা। একইসাথে তামাকমুক্ত পরিবেশে সুস্থ ও সুন্দরভাবে আগামী প্রজন্ম যাতে বেড়ে উঠতে পারে আসুন তা সকলে মিলে নিশ্চিত করি – যা হতে পারে আমাদের সকলের জন্যই পরম গর্বের একটি বিষয়।
Tags: Written by Bidhan Chandra Pal
You can comment below, or link to this permanent URL from your own site.